নিউ ওয়ার্ল্ডে আফ্রিকানদের অবদান ও উত্তরাধিকার

16
ফেসবুকে ফলো করুন

যখন অটোম্যানদের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো সহজে বাই রোডে এশিয়ায় প্রবেশ করতে পারছিল না, তখন মশলা বাণিজ্য থেকে লাভের আশায় পশ্চিম সমুদ্রপথ খোঁজার পরিকল্পনা করে- যার অগ্রপথিক ছিলেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস। বর্তমান এল সালভাদরে (সেন্ট্রাল আমেরিকা) তিনি ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম অবতরণ করেন। মজার ব্যাপার হলো- তিনি জীবিত থাকতেও জানতেন না যে, তিনি নতুন একটি মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন- যেটা এখনো নিউ ওয়ার্ল্ড বা আমেরিকা মহাদেশ নামে পরিচিত।

তিনি একজন ইটালিয়ান হলেও স্প্যানিস রাণী ইসাবেলার অর্থায়নে কাজটিতে সফলতা লাভ করেছিলেন। একটা অবাক করা ব্যাপার হলো যে, পুরো দক্ষিণ আমেরিকা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত স্প্যানিসদের আধিক্য এখনো চলমান। এর ক্রেডিট অবশ্যই রাণী ইসাবেলা ও নাবিক কলম্বাসের। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ডাচ/ওলন্দাজ (নেদারল্যান্ড), ডেনমার্ক, ব্রিটিশ, ফ্রেন্সরা নিউ ওয়ার্ল্ড তথা আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয়ানদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য যে, শক্তিশালী নৌ শক্তি থাকা সত্ত্বেও তুর্কিরা নিউ ও্রয়ার্ল্ডমুখী হয় নাই, মূলত কনটিনিউয়াস যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে।

প্রাথমিকভাবে, স্প্যানিসরা দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় পুরোটা দখল করে, শুধুমাত্র ব্রাজিল ছাড়া। অন্যদিকে, কানাডা ও বর্তমান আমেরিকাতে ফ্রান্স ও স্প্যানিসরা দখল করলেও একটা সময় ব্রিটিশরা ফ্রান্সদের বিতাড়িত করে উত্তর আমেরিকায় তাদের একক আধিপত্য বিস্তার করে। তবে মেক্সিকোতে স্প্যানিসরা শক্তিশালী অবস্থান করে নিয়েছিল। এই হিসেবে, সহজ ক্যালকুলেশন হলো- আমেরিকার দুটি মহাদেশেই বর্তমানে স্প্যানিস ও ব্রিটিশদের আধিপত্য। অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকা পুরোপুরি স্প্যানিসদের কলোনি শুধুমাত্র ব্রাজিল বাদে (পর্তুগীজ)।

আরেকটা বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- যখন প্রথম আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার হয়, তখন তারা নেটিভ আমেরিকানদের দেখে অবাক হয়ে যায়। যারা ছিল পৃথিবীর মূল-ভূখন্ডের বাইরে। তারা কিভাবে ইউরোপীয়ানদের আগে ল্যাটিন আমেরিকা বা আমেরিকা মহাদেশে আসল। ঐতিহাসিকগণ ধারণা করেন যে, বেরিং প্রণালী (রাশিয়া টু আলাস্কা) দিয়েই প্রায় ৫০০০ বছর আগে হিউম্যান মাইগ্রেশন Ancient North Eurasia থেকে আমেরিকায় গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, ইউরোপীয়রা আমেরিকায় প্রবেশের পরে প্রথমত আধুনিক সভ্যতা বা এডভান্স টেকনোলজি থেকে পিছিয়ে থাকা নেটিভ আমেরিকানদের উপরও ব্যাপক অত্যাচার চালিয়েছিল।

আজকে আমি যে বিষয়টা এখানে উল্লেখ করতে চাই, সেটা হলো ইউরোপীয়রা আমেরিকায় যাওয়ার পরে নেটিভ আমেরিকান উপর নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করে ও দেশগুলো ধীরে ধীরে দখল করে নেয়। কিন্তু কৃষি ও খনিজ পদার্থ আহরণের জন্য তাদের অনেক জনবলের দরকার ছিল। আর সেটা বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপীয়রা প্রায় ৪০০ বছর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে নারী-শিশু-পুরুষ জোরপূর্বক ধরে নিয়ে আসতো এবং তাদেরকে দাস হিসেবে ব্যবহার করতো।

এই দীর্ঘ সময়ে (১৪৪৪-১৮৩০) প্রায় ১৫ মিলিয়নের বেশি লোক/মানে আফ্রিকান কালো মানুষদের আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তাদেরকে নিয়ে আসতো। সমুদ্র পাড়ি দেয়ার পথে প্রায় ২ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় ১০-১৫% যাত্রার আগে/পরে নানা রোগে/অত্যাচারে মারা গিয়েছিল। মানব ইতিহাসে এটা ছিল এক কলঙ্কজনক অধ্যায়- যেটা ইতিহাসে “Transatlantic Slave Trade”- ট্রান্স-আটলান্টিক দাস প্রথা নামে পরিচিত। মূলত ব্রাজিল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই কালো আফ্রিকানদের পাচার করা হয়েছিল। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের প্রায় ১৪ শতাংশের বেশি ব্ল্যাক আফ্রিকান-আমেরিকান।

উল্লেখ্য যে, American Civil War-এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল Issue of slavery, আমেরিকা তথা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনই আমেরিকা থেকে slavery বা দাসপ্রথা আইন করে চিরতরে বাদ দেন। এর ফলশ্রুতিতে, তাঁকে আতাতীয় হাতে নিহতও হতে হয়েছিল। নিউ ওয়ার্ল্ড বা আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপনের পর, আমেরিকার রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটে- তার জন্য অবশ্যই কালো আফ্রিকান অবদানও আছে। তবে বর্তমানে জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ১৯৪৮ সাল থেকে দাসপ্রথা আর্ন্তজাতিকভাবে অবৈধ করা হয়েছে। শেষ কথা হলো- জাতিসংঘকে ব্যবহার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের International World Political Order-গুলো বাস্তবায়ন করে থাকে। এটা তাদের ক্রেডিটও বটে।

লেখক: মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ-বিন-আনোয়ার
ভূ-রাজনৈতিক লেখক, গবেষক এবং শিক্ষক
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, গ্রিন স্কলার্স স্কুল এন্ড কলেজ
আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ