বিশেষ প্রতিনিধি : সাদিয়া আক্তার (২৪)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। দেড় বছর আগে পারিবারিকভাবে স্থানীয় ফতেপুর ইউনিয়নের বগাদী এলাকার আব্দুর রবের ছেলে আজিজুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয়। ১০ মাসের একটি ফুটফুটে ছেলে সন্তানও ছিল তার। দুই বছর স্বামী ও শাশুড়ির অত্যাচার সহ্য করেও বাঁচতে পারলোনা সাদিয়া। স্বামী আজিজুল ইসলাম, শাশুড়ি ও ননদসহ অন্যান্যরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেয় সিলিং ফ্যানের সাথে। এর আগে গত বুধবার (১৯ জুন) রাতের যেকোনো সময় এ ঘটনা ঘটে। তবে অভিযুক্তরা বলছেন সাদিয়া আত্মহত্যা করেছেন। হত্যাকান্ডকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করলেও গ্রামবাসী ক্ষোভে ফুসে উঠেছে। গ্রামের লোকজন সাদিয়ার স্বামী, শাশুড়ি ও ননদের দৃস্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করেছে।

এদিকে, পুলিশের কাছে সাদিয়ার শ্বশুর বাড়ির লোকজন বলেছে, মেয়ে জামাতাকে ঈদের দাওয়াত করতে গিয়ে গিয়েছিলেন হতভাগ্য পিতামাতা। অশ্রাব্য গালিগালাজের পর জামাতা, শাশুড়ি ও অন্যান্যরা শলার ঝাড়– দিয়ে পিটিয়ে আহত করে বাড়ি থেকে বের করে দেন মেয়ের পিতা মাতাকে। একদিকে পিতা-মাতার অপমান অন্যদিকে, শাশুড়ি, স্বামী ও ননদসহ শ্বশুর বাড়ির লোকজনের ন্যাক্কারজনক গঞ্জনা ও মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে সাদিয়া আক্তার।
এ ঘটনা গত ১৯ জুন আড়াইহাজার উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের বগাদি দড়িপাড়া গ্রামে ঘটেছে। পরদিন ২০ জুন থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। শুক্রবার নিহতের ভাই ফরহাদ ভূইয়া সাংবাদিকদেরকে ঘটনা অবহিত করেন। ফরহাদ ভূঁইয়ার দাবি, তার ছোট বোন সাদিয়ার মুখ-মন্ডল ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ওই সকল আঘাতের চিহ্ন দেখে অনুমান করতে পারি আমার বোনকে পিটিয়ে হত্যা করে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল তার স্বামী ও শাশুড়িসহ অন্যান্যরা।
নিহতের ভাই ফরহাদ জানায়, তারা চার ভাইবোন। তিন বোন এক ভাই। ভাইবোনদের মধ্যে সাদিয়া আক্তার সবার ছোট। সাদিয়া ছিলেন খুব মেধাবী ছাত্রী। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর পারিবারিক প্রস্তাব মতে, হাইজাদী ইউনিয়নের কলাগাছিয়া গ্রামের সাদিয়া আক্তার ও ফতেহপুর ইউনিয়নের বগাদী গ্রামের ফুফাত ভাই আজিজুল ইসলামের বিয়ে সম্পন্ন হয়। দু’জনেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া। স্বামী আজিজুল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। বর্তমানে বিকাশ কর্মকর্তা। গৃহবধু সাদিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বিয়ের পর থেকে স্বামীসহ শাশুড়ি ও ননদসহ অন্যান্যরা মানসিক যন্ত্রণা দিত। কটু কথা বলতো। এ নিয়ে পারিবারিকভাবেই বেশ কয়েকবার ঝামেলা মিটিয়ে দেয়া হয়েছে। তবুও সাদিয়ার শাশুড়ি অকথ্য ভাষায় যখন তখন আক্রমণ করতো সাদিয়াকে। তার মা বাবাকে তুলে অশ্রাব্য কথা বলতো।
সর্বশেষ, এবার ঈদুল আযহার দাওয়াত দিতে এলে ১৯ জুন বিকেল ৫ টায় সাদিয়ার মা বাবাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং শলার ঝাড়– দিয়ে আক্রমণ করে বাড়ি থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করে সাদিয়ার স্বামী, শাশুড়ি ও ননদ বিলকিস সহ অন্যান্যরা। চোখের সামনে পিতা-মাতার চরম অপমান সইতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সাদিয়া আক্তার। সে প্রতিবাদ করেছিল। এর জের ধরে ক্রুদ্ধ মেজাজে স্বামী, শাশুড়ি ও ননদ মিলে বেদম পিটিয়ে হত্যা করে সাদিয়াকে। তবে ওরা এই বলে প্রচার করে যে, পারিবারিক ঝগড়া হওয়ায় সাদিয়া অভিমান করে সবার অগোচরে বিকাল সোয়া ৬টা নাগাদ সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস নেয়।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বামী, শাশুড়ি ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনের নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা সাদিয়া আক্তারকে আত্মহননের পথে ধাবিত করেছে। শ্বশুর বাড়ির লোকজন পরোক্ষভাবে সাদিয়াকে হত্যা করেছে। সাদিয়ার ১০ মাস বয়েসি একটি ফুটফুটে ছেলে সন্তান রয়েছে। শিশুটির নাম ওমর ইবনে আজিজ। এ ঘটনায় নিহতের ভাই ফরহাদ বাদি হয়ে আড়াইহাজার থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় বোন জামাতা আজিজুল ইসলাম (২৭), শাশুড়ি খাদিজা বেগম (৬০) ও ননদ বিলকিস (৩৫) কে আসামী করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সাদিয়ার স্বামী, শাশুড়ি ও ননদের অশ্রাব্য গালিগালাজ ও মানসিক যন্ত্রণার কথা গ্রামের সকলেই কমবেশি অবগত। গ্রামবাসী সাদিয়ার মৃত্যুর জন্য স্বামী, শাশুড়ি ও ননদকে দায়ী করেছেন। তারা এই সামাজিক ক্রিমিন্যালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। এদিকে, নিহত সাদিয়ার লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।



