বিশেষ প্রতিনিধি : টানা ৩ ঘন্টার অভিযান। শুক্রবার দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা। উদ্ধার হল ২ ড্রাম চোলাই মদ। ধরা পড়েছে দুই মাদক বিক্রেতা। জয় (২৫) ও নির্মল (৪৮)। পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে পালিয়ে গেছে মাদক বিক্রেতারা। অনেকে মাদক লুকিয়ে ফেলেছে গোপন স্থানে। রোজার দিনে তিনঘন্টা মাদক বিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালানোর কারণে গোপালদী তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশদের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়েছে রামচন্দ্রদী ও গোপালদীর সাধারণ জনগণ।
গোপালদী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আতাউর রহমান এর নেতৃত্বে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে আরো উপস্থিত ছিলেন এসআই সোহাগ সাহা ও গোপালদী পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম। অভিযান চলে রামচন্দ্রদীর ঋষিপাড়ায়। ঋষিপাড়ার ১৫/২০ টি সন্দেহভাজন বাড়িতে সাঁড়াশি অভিযান চলাকালে অধিকাংশ মাদক বিক্রেতা পালিয়ে যায়। মাদকসেবী সোর্স মারফত পুলিশের খবর পেয়ে চোলাই মদ বিক্রেতারা দ্রুত আত্মগোপন করে। তবুও পুলিশ একেকটি বাড়িতে কড়া তল্লাসী চালায়।
আড়াইহাজার উপজেলার কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে গোপালদীর ‘রামচন্দ্রদী এলাকা’। বিভিন্ন মাদক ও চোলাই মদের জন্য রামচন্দ্রদীর দু’টি পাড়া মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। এক ঋষিপাড়া দুই পাঁচানী। দু’টি পাড়ায় কমপক্ষে ৩০ জন চোলাই মদের কারবারে লিপ্ত। হাজার নিষেধ করলেও ওরা প্রশাসনের কথায় কখনো কর্ণপাত করেনা। অদৃশ্য ক্ষমতাবলে চোলাই মদ তৈরী ও বিক্রি করে থাকে।
ঋষিপাড়ায় নিজেদের প্রয়োজনেই ওরা চোলাই মদ তৈরী করে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ওরা এখন নিজেদের প্রয়োজনের জন্য চোলাই মদ তৈরী করে না। শুধুমাত্র বিক্রির জন্য তৈরী করে। দিনরাত চোলাই মদ বিক্রি করে। ঋষিপাড়ার অনেকেই গরুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করণের কাজ ছেড়ে দিয়েছে। ওরা এখন নিয়মিত চোলাই তৈরী করে মদ বিক্রেতা বনে গেছে। বিক্রেতা ও ক্রেতাদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। ওরা ঘরে বসিয়েই ক্রেতাকে মদ পান করতে দেয়।
অনুসন্ধান করে জানাগেছে, সন্ধ্যা হলেই ঋষিপট্টি জেগে উঠে। ঘরে ঘরে আড্ডা জমে। আড্ডার সকলেই মাম পানির বোতল নিয়ে অস্বাভাবিক আচরন করে। মামের বোতলের তরল পানীয় ওরা পান করে বেশ আয়েশ করেই । শিশুরা বিষয়টি বুঝতে পারেনা। একটি শিশু আড্ডাস্থল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটি মামের বোতলের ছিপি খুলে মুখে দিয়েই চিৎকার করে উঠে। ওই বোতলে তখনো ক’ফোটা চোলাই অবশিষ্ট ছিল। এক শিশুর কৌতুহলে মামের বোতলের রহস্য ভেদ হয় ঋষিপট্টির। আসলে মামের বোতলে ভরে নেশাখোরের দল চোলাই গিলতেই ঋষিপট্টিতে আসে।
আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী পৌরসভার রামচন্দ্রদী এলাকাতেই ঋষিপট্টির অবস্থান। এখানে মূলত: ঋষি পরিবারের বসবাস। ওদের মূলপেশাই হচ্ছে কাচা চামড়া ও নিচু শ্রেণীর কাজ করা। ওরা এমন কাজকর্ম করে যে, কাজের পরিবেশটা সব সময় থাকে পূতিগন্ধময়। তাই ঋষিপট্টির লোকজন কাজের সময় ও পরে চোলাইমদ পান করে থাকে। এই চোলাইমদ ওরা নিজেরাই তৈরী করে নেয়। পুতিগন্ধময় পরিবেশে নোংরা কাজ করে বিধায় প্রশাসন ওদের মদপান ও মদ তৈরীর বিষয়টা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেকে।
কিন্তু আজকাল প্রশাসনের ছাড় দেয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাতে শুরু করেছে। ঋষিপট্টির লোকজন নাজায়েয কাজ করে বেড়াচ্ছে বুক ফুলিয়ে। ঋষিপট্টিতে হাজারো লোকের বসবাস। সবাই কমবেশি চোলাই তৈরী ও বিক্রি করে। এরমধ্যে পালেরগোদা ৮/৯ জন সকলকে টেক্কা দিয়ে চোলাইয়ের বার খুলে বসেছে। ঘরের ভেতর হোগলা-পাটি বিছিয়ে দেয়। সেখানে সন্ধ্যার পর থেকে বাবুরা আসে চোলাই গিলতে। আগে প্লাটিকের পোটলায় চোলাই বিক্রি হত। এখন মাম পানির বোতলকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঋষিপট্টির কয়েকজন লোক অভিযোগ করেন যে, ‘ভাই হামলোগ চোলাই পান করি। মাগার বেচতা নেহি। হামাদের ঘরে বাচ্চালোগ ভি আছে ! হামরা তাদের সামনে ভি খাইনা। আড়ালে খাই। মাঝে-মইদ্দে পোলাপানরা দেখিয়া ফেললে বলি ইয়ে দারু পিয়েগাতো হামারা রোগ দূর হয়ে যাতেহে। কিন্তুক হামাদের পড়শি লোক ইহা মানবার চায়নারে। ওই শালারা নিজের ঘরমে বেঠকার চোলাই মদের ধান্ধা করে ভি। ওরা চোলাইমদ মাম পানিকা বোতলমে ভরে লিয়ে বিক্রি করবার লাগে। সবদিন মামের বোতলে ভরে লিয়ে চোলাই মদ বেচতা হ্যায়।’
রামচন্দ্রদী এলাকার কয়েকজন জানান, ঋষিপাড়ায় এখন সন্ধ্যার থেকে বসে মাদকের হাট। যদিও ঋষিপট্টির লোকজন নিজেরাই কাজের প্রয়োজনে চোলাইমদ তৈরী করে পান করে। তবুও প্রশাসনের খতিয়ে দেখা দরকার সন্ধ্যার পর এখানে কি ঘটছে। সন্ধ্যার ঘরে ঘরে মদের আড্ডা জমে। সেই সব আড্ডায় যোগ দিতে আড়াইহাজারের নানা যায়গা থেকে মদখোরের দল আসে। ওরা বসে মাম পানির বোতলে ভরা চোলাইমদ পান করে হৈ চৈ হাঙ্গামা বাধিয়ে দেয়।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, রামচন্দ্রদীর কিছু প্রভাবশালী লোক ঋষিপাড়ার চোলাই মদ বিক্রেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। যার দরুণ ওরা এতটা সাহস দেখায়। ঋষিপাড়ায় ও পাঁচানীতে ওই সকল প্রভাবশালীদের কারণেই মদ বিক্রি হয়। ঋষিপাড়ার লোকেদের এতটা সাহস নেই। ওদের প্রশ্রয়দাতারাই সাগস যোগায়। এই প্রশ্রয়দাতাদেরকে সবাই চিনে ও জানে। কিন্তু ভাসুরের নাম কেউ মুখে আনতে চান না। ছদ্মবেশী প্রভাবশালী মদ্যপায়ীরাই আবার কখনো কখনো মদ বিক্রেতাদের বিচার শালিস করে বেড়ায়।


